ঢাকা

No edit

🔴 ব্রেকিং নিউজ
ঢাকাঃ
🔴 ব্রেকিং NEWS
sotorkobarta.com
সর্বশেষ খবর পেতে ভিজিট করুন www.sotorkobarta.com

No edit

সংবাদ শিরোনাম ::
Header Ads

ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের দখলে ‘মাদকের আখড়া’ টিটিসি হল, নিরুপায় প্রশাসন

প্রকাশঃ
অ+ অ-


নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 

ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) ক্যাম্পাসের আবাসিক হল দখলের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা কলেজ ছাত্রদল ও কলেজটির শাখা ছাত্রদলের একটি অংশ মিলে হল দখল নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে বহিরাগত দিয়ে আধিপত্য বিস্তার, সিট বাণিজ্য, অবাধে মাদক দ্রব্য সেবন ও বিক্রির মতো গুরুত্বর অভিযোগও পাওয়া গেছে। ফলে বৈধ শিক্ষার্থীদের হল ব্যবহারের সুযোগ যেমন সীমিত হচ্ছে তেমনি কলেজটির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

রাজধানীর মিরপুর রোডে ঢাকা কলেজের পাশেই টিচার্স ট্রেনিং কলেজের (টিটিসি) অবস্থান। দক্ষ শিক্ষক তৈরির উদ্দেশে ৮ একর জমি নিয়ে ১৯০৯ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা ক্ষেত্রে মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই টিটিসি কলেজের বিএড শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক হলের তৃতীয় তলার পশ্চিম পাশের পুরো ব্লক এবং এমএড ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে ঢাকা কলেজের প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এখানে গাঁজা, মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবা সেবন এবং বিক্রি করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজটির মূল ফটকের ঠিক সামনেই অবস্থিত যে ছাত্রাবাসটি চোখে পড়ে, সেটিই মূলত বিএড ভবন। ভবনটির তৃতীয় তলার পশ্চিম পাশের ব্লক বর্তমানে ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের অবৈধ দখলে রয়েছে। ওই অংশের প্রবেশমুখে ভাঙা দেয়ালের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ দখল ঠেকাতে এবং কক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কলেজ প্রশাসন দেয়াল তুলে পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দেয়াল ভেঙে পুনরায় প্রবেশপথ খুলে দেয়।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে টিটিসি শিক্ষার্থীরা। তারা নিজ কলেজের হল থাকা সত্ত্বেও হলে উঠতে পারছে না। এমনকি শিক্ষকরাও হলে ওঠানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীদের শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে হলে উঠতে হচ্ছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা। ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘কলেজ প্রশাসনের নীরব ভূমিকা এবং প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে তারা হল দখল করে আছে।’

মাদকের ভয়াবহতার কথা উঠে এসেছে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক  ড. মো. খাদেমুল ইসলামের মুখেও।

অধ্যক্ষ খাদেমুল বলেন, ‘আমি এই কলেজে প্রথম যোগদানের পরই মাঠে ফেনসিডিলের বোতল পড়ে থাকতে দেখেছি। এতে স্পষ্ট হয়, এখানে মাদকের আনাগোনা রয়েছে।’

‘এখানে দীর্ঘদিন ধরে তিন চার লক্ষ টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি, এখানে গাঁজা, মদ ও ইয়াবার মতো মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়। এতে অনেক ছেলে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন’, যোগ করেন তিনি।

‘রাজনৈতিক শর্তে’ সিট পায় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) ক্যাম্পাসের আবাসিক হলে সিট পেতে শুরুতেই নানা শর্তে সম্মত হতে হয় শিক্ষার্থীদের। সেগুলোর প্রথম অন্যতম ছাত্রদলের রাজনীতি করতে হবে, নিয়মিতভাবে ছাত্রদলের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে হবে, নেতারা যা বলবে তাই করতে বাধ্য থাকতে হবে- এসব বিষয়ে সম্মত হলে প্রাথমিকভাবে সিট পাওয়ার আশ্বাস মেলে। পরবর্তিতে অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে সিট পায় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। অথচ, টিটিসি কলেজের নিয়মিত ও বৈধ শিক্ষার্থী হলেও অবৈধভাবে অবস্থানরত ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। ঢাকা কলেজের ২০২৩-২৪ সেশনের এক শিক্ষার্থী অবৈধভাবে টিটিসি হলে থাকেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। তবে তার বক্তব্যের রেকর্ড ঢাকা মেইলের কাছে সংরক্ষিত আছে।

এই শিক্ষার্থী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘টিটিসি হলে ওঠানো হয় শর্তসাপেক্ষে রাজনৈতিক শেল্টারের আওতায়। এখানে প্রধান শর্ত হলো- হলে উঠতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে হবে।

‘যে কেউ যদি এই শর্তে রাজি হয়, তবেই তাকে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়’, যোগ করেন তিনি।

টিটিসিতে সিট পেতে বহিরাগতদের ব্যয় এককালীন ২ হাজার, মাসে ১ হাজার

শুধু রাজনৈতিক শর্তই নয়, টাকাও দিতে হয় সিট পেতে। একাধিক সূত্র জানায়, এক্ষেত্রে হলে উঠতে এককালীন দুই হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার থেকে বেশিও অর্থও গুনতে হয় শিক্ষার্থীদের। 

সিটের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অন্যান্য সুবিধাও আদায় করা হয়। আর এই সবকিছুই দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকা কলেজের প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের হাতে।

ঢাকা কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, রাজনৈতিক শর্ত মানার পর বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যেককে দুই হাজার বা তার থেকে বেশি টাকা এককালীন দিতে হয়। সিট দখলে রাখতে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকাও দিতে হয়।

একাধিক শিক্ষার্থী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সিট বরাদ্দের বিষয়গুলো দেখেন (আনিসুর রহমান) আনিস ভাই।’

টিটিসি হল দখলের নেতৃত্বে কারা?

বিভিন্ন সূত্রও জানায়, টিটিসি কলেজ হল নিয়ন্ত্রণের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান আনিস। তার সঙ্গে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিয়াদ আহমেদ ও বহিষ্কৃত নেতা ফিহান আলমও যুক্ত রয়েছেন।

টিটিসির একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছাত্রদলের নেতাদের প্রভাব বিস্তারে টিটিসি বিএড ভবনের তৃতীয় তলার বিভিন্ন রুম এখন মাদকের আতুরঘরে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, হল সুপার চাইলেও কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারছেন না।’ হলে অবৈধভাবে অবস্থানরত ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের এক কর্মী বলেন, ‘সত্যি বলতে তারা (কলেজ প্রশাসন) চাইলেই আমাদের বের করতে পারত, কিন্তু তারা তেমন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। আমরাও ধৈর্য ধরে আছি। আমরা শিক্ষার্থী, স্বাভাবিকভাবেই থাকতে চাই।’

শুধু আমার নাম কেন আসবে? প্রশ্ন অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার

তবে হল দখলে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। এ বিষয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে ও শর্তসাপেক্ষে টিটিসি কলেজের হলে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের অবৈধভাবে ওঠানোর অভিযোগটি ভিত্তিহীন।’

‘ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের টিটিসিতে অবৈধভাবে থাকার বিষয়টি সবার জানা। এখানে ঢাকা কলেজের অনেকেই থাকে, শুধু আমার নাম কেন আসবে? এটা ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে’, যোগ করেন তিনি।ছাত্রদলের এই নেতা বলেন, ‘আমি টিটিসিতে ভর্তি হয়েছি,শুধু আমি নই, সবাই মিলে টিটিসির হলে আছি ঢাকা কলেজের হল সংকটের কারণে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে যা করি, কয়েকজন ছোট ভাই অসুবিধায় থাকে। তাদের একটি রুমে চাপাচাপি করে থাকতে বলি, দুইজনের জায়গায় তিনজন থাকতে বলি। ঢাকা কলেজে রাজনীতি করি, আমরা কি ছোট ভাইদের কাছ থেকে টাকা নিতে পারি? বরং আমাদের ছোট ভাইদের দিতে হয়।’

টিটিসি থেকে এদের সরাতে আর্মির সঙ্গে কথা হয়েছে: ঢাকা কলেজ অধ্যক্ষ

জানতে চাইলে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ‘এদেরকে (দখলকারীদের) সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আর্মির সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে।’

‘এর আগেও আমরা একাধিকবার নোটিস দিয়েছি। আমি নিজে সেখানে গিয়ে দেয়াল তুলে দিয়েছিলাম, কিন্তু পরবর্তীতে তারা সেই দেয়াল ভেঙে ফেলেছে’, যোগ করেন তিনি।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘কলেজ প্রশাসন যদি শক্ত অবস্থান না নেয়, তাহলে আমরা বাইরে থেকে আর কতটুকু কি পারি? যে কোনো উপায়ে তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হোক।’

একটি মন্তব্য করুন